নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে নারকীয় হত্যাকাণ্ড: কুরআন বর্ণিত আসহাবুল উখদূদের ঘটনার কাকতালীয় পূনরাবৃত্তি

-শায়খ আহমাদুল্লাহ

গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের আন নুর মসজিদে অষ্ট্রেলিয়ান খ্রিস্টান উগ্রবাদী ব্রেনটন টারান্ট জুমআর নামাজ পড়তে আসা প্রায় অর্ধশত মুসলিমকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন।

এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে সারা বিশ্বের মুসলিমদের হ্রদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। একজন মুসলিমের কষ্টে অন্য মুসলিম ব্যথিত হবে এটাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এর ব্যতিক্রম হলে তার প্রকৃত মু’মিন হওয়া নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

মুসলিম শরীফে বর্ণিত, নুমান ইবনে বাশীর (রা) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “মুসলিমদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। দেহের কোন একটি অঙ্গ যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয় তাহলে বাকি অঙ্গগুলো জ্বরে আক্রান্ত ও বিনিদ্র রাত কাটিয়ে সহমর্মিতা দেখায়।”

তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর বান্দাদেরকে যুগে যুগে নির্মম হত্যার শিকার হতে হয়েছে। এটা কোন নতুন বিষয় নয়। মহান আল্লাহ সূরা বরূজে এমনই একটি ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করেছেন। যেটাকে আসহাবুল উখদুদ বা গর্ত খননকারীদের ঘটনা বলা হয়। ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেই গণহত্যার অনেক মিল খুজেঁ পাওয়া যায়। বিভিন্ন তাফসীরের বর্ণনা মতে সৌদি আরবের নাজরান কিংবা ইয়ামেন বা সিরিয়ায় রাসুলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আবির্ভাবের ৪০ বছর পূর্বে আসহাবুল উখদুদের ঘটনা ঘটেছিল।

নিউজিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলা প্রসঙ্গে কোনো কোনো মিডিয়ার বক্তব্য হলো, ইউরোপ ও উন্নত দশেগুলোতে অভিবাসন বিরোধিতা ও অভিবাসীদরে প্রতি ক্ষোভ থেকে হত্যাকারী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো অভিবাসী তো শুধু মুসলিমরাই নন, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অভিবাসীদরে সংখ্যাও কম নয়। তাহলে কেবল মুসলিমদের মসজিদে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো কেন? আমরা নিশ্চই অন্য র্ধমাবলম্বীদের উপাসনালয়েও এ ধরণরে হামলা সর্মথন করবো না। কিন্তু মুসলিমদের মসজদিকে হামলার লক্ষবস্তু বানানোয় বিষয়টি পরিষ্কার যে, ইসলাম ফোবয়িা ও মুসলিম বিদ্বেষ থেকেই এই র্ববর হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা কিংবা মস্তিষ্কবিকৃত কোন লোকের দ্বারা সংঘটিত কোন দুর্ঘটনা নয়।  এটি সারা বিশ্বে মুসলিমদের প্রতি প্রতিহিংসা ও অবিচারেরই অংশ।

কুরআন বর্ণিত আসহাবুল উখদুদ বা গুহা খননকারীরা আল্লাহর প্রতি ঈমানদারদেরকে নির্মমভাবে গণহারে হত্যা করার কারণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন-

وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَن يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ

র্অথ: তারা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, তারা প্রশংসিত, পরাক্রান্ত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল।

ক্রাইস্টচার্চেও এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অপরাধেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।

আসহাবুল উখদুদ তথা মুসলিম বিদ্বেষীরা আগুন জ্বালিয়ে তাতে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল মুসলমান নারী ও পুরুষদরে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মুসলিম বিদ্বেষীও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে মুসলিমদের হত্যা করেছে।

মুমিনদেরকে আগুনের গর্তে ফেলে হত্যা করে নিহতদের মৃত্যুকষ্ট উপভোগ করেছিল আসহাবুল উখদুদ তথা গুহা খননকারীরা। আর নিউজিল্যান্ডের খুনি ব্রেনটন টারান্টও মাথায় ক্যামেরা সেট করে মুসলিমদের মৃত্যুকষ্ট উপভোগ করেছে আর অন্য মানুষদের দেখিয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ড থেকে যা শিক্ষণীয়ঃ

১. নিউজিল্যান্ডের এই হত্যাকাণ্ড কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি বড় পরিকল্পনার অংশ। সব যুগেই যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন তাদের জন্য দুনিয়া সংকীর্ণ হয়ে আসে। কারণ মৃত্যুর পর তার জন্য রয়েছে নূন্যতম ১০ দুনিয়ার সমান জান্নাত। সে জন্য মুমিনদের কখনো বিচলিত হওয়া উচিত নয়।

২. ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলায় খৃস্টানদের নিহত হওয়ার ঘটনায় এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের অনেকে এবং তথাকথতি নাস্তিকরা নানাভাবে প্রতিবাদ করেছে। সেটা অবশ্যই প্রতিবাদ করার বিষয় ছিল। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের হত্যাকাণ্ডে তাদের উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিবাদ দেখা যায় নি। উল্টো আরো নানা রকম বিভ্রান্তিমূলক কথা তারা প্রচার করে মুসলমানদের আঘাত দিয়েছে। এ থেকে তাদের কপটতা ও অন্তরে লুকানো মুসলিম বিদ্বেষ পরিস্কার হয়ে যায়।

৩. এ ধরণরে হত্যাকাণ্ড মুসলিমদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর জন্য জীবন দান এ তো মুসলিমের জীবনরে পরম স্বপ্ন ও চরম সৌভাগ্য। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে কিছু মানুষকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে নবী ও সিদ্দীকগনের পরর্বতী মাকাম দান করতে চান। ইরশাদ হয়েছে-

وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاء

আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪০)

৪. এই নারকীয় ঘটনার পর নিউজিল্যাণ্ড ও আরো কয়েকটি দেশে কিছু অমুসলিমরা মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে বলেছিলেন, তোমরা নামাজ পড় আমরা তোমাদের পাহারা দিব। দেশটির প্রধানমন্ত্রীসহ লাখো অমুসলমি নারী হিজাব পরে শত শত ব্যথিত মুসলিমদের পাশে এসেছেন সান্তনা দেয়ার জন্য। অথচ কোন মুসলিম দেশ বা গোষ্ঠী উক্ত ঘটনায় সেভাবে প্রতিবাদ বা বলষ্ঠি কোন পদক্ষেপ দেখাতে পারল না। এটা লজ্জার।

৫. শাহাদত বরণ করার তামান্না সকল মুসলিমের থাকা উচিত। মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কেউ যদি তামান্না রাখে যে সে শাহাদত বরণ করবে তাহলে সে তার নিজ বিছানায়ও যদি মারা যায় তাহলেও আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।

হযরত উমর (রাঃ) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ আমি মদিনায় মরতে চাই, আবার শাহাদাতের মৃত্যুও চাই। আল্লাহ তুমি আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দিও। এ দু’য়া শুনে তাঁর মেয়ে হাফসা (রা:) বললেন, এটি কেমন সাংঘর্ষিক দোয়া হলো। আপনি শহীদ হতে চাইলে মদীনার বাইরে যেতে হবে। কারণ জিহাদ তো মদীনায় হয় না।  তাহলে আপনি মদীনায় মৃত্যু বরণ ও শাহাদাত-এক সঙ্গে দুইটা কিভাবে পাবেন?  তিনি বললেন, আল্লাহ সবই পারেন। অবশেষে তিনি ফযরের নামাজ পড়ার সময় ফিরোজ নামে এক অগ্নিপূজকের ছুরিকাঘাতে শাহাদাত বরণ করেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শাহাদাতের মৃত্যু দান করুন। ক্রাইস্টর্চাচে নিহতদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন এবং তাদের শোর্কাত পরবিারকে সান্তনা নসীব করুন। আমীন।

(ভূমিপল্লী জামে মসজিদে ২২.০৩.২০১৯ তারিখে প্রদত্ত খুতবা থেকে শ্রুত লিখন: মুশাররফ হুসাইন)